আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন নেইমার
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন নেইমার — ব্রাজিল ফুটবলের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সমাপ্তি
ফুটবল বিশ্বের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক আবেগঘন মুহূর্ত। ব্রাজিলের কিংবদন্তি তারকা নেইমার জুনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে ব্রাজিলের নাটকীয় পরাজয়ের পরই তিনি এই সিদ্ধান্ত জানান। ম্যাচ শেষে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি। আমার যাত্রা এখানেই শুরু হয়েছিল, আর এখানেই শেষ হলো। এখন সব শেষ।” এই কয়েকটি কথাতেই যেন ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে যায়।
ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। আশ্চর্যের বিষয়, ২০১০ সালে ঠিক এই স্টেডিয়ামেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। অভিষেক ম্যাচেই তিনি গোল করেছিলেন। আর ১৬ বছর পর একই মাঠে ব্রাজিলের হয়ে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেললেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন নাটকীয় সমাপ্তি খুব কম খেলোয়াড়ের ভাগ্যেই জোটে।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে শুরু থেকেই চাপে ছিল ব্রাজিল। দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের দুর্দান্ত আক্রমণে দুই গোল হজম করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা পিছিয়ে পড়ে। ইনজুরির কারণে পুরো টুর্নামেন্টে সীমিত সময় খেলা নেইমার দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। যোগ করা সময়ে তিনি পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে ব্যবধান কমালেও ব্রাজিলকে আর হার এড়াতে পারেননি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।
এই হার শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়, বরং ব্রাজিলের জন্য ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে সবচেয়ে আগের বিদায়ের তিক্ত স্মৃতি হয়ে থাকল। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত শেষ ষোলোর গণ্ডিই পার হতে পারল না। আর সেই হতাশার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল নেইমারের আন্তর্জাতিক অধ্যায়।
নেইমার ব্রাজিলের হয়ে ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং ৮০টি গোল করে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। শুধু গোল নয়, অসংখ্য অ্যাসিস্ট, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এবং ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি এক যুগ ধরে ব্রাজিল ফুটবলের মুখ হয়ে ছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অবদান পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বড়।
তবে একটি আক্ষেপ সারাজীবন থেকেই গেল। এত বড় ক্যারিয়ারেও বিশ্বকাপ ট্রফি জেতা হলো না নেইমারের। ২০১৪ সালে নিজের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে সেমিফাইনাল খেলতে পারেননি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও ব্রাজিল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ নাচও শেষ হলো নরওয়ের বিপক্ষে পরাজয়ের মাধ্যমে।
বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণেও পুরোপুরি নিজের সেরাটা দিতে পারেননি নেইমার। ডান পায়ের কাফের চোটে তিনি টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। মাত্র দুটি ম্যাচে খেলতে পেরেছিলেন। তবুও শেষ ম্যাচে মাঠে নেমে গোল করে বিদায় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ভাগ্য তার পাশে ছিল না।
নেইমারের বিদায় ঘোষণার পর ফুটবল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বার্তা আসতে শুরু করে। সাবেক কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং থিয়েরি অঁরি তার অসাধারণ ক্যারিয়ারের প্রশংসা করে বলেন, নেইমার এমন একজন ফুটবলার যিনি পুরো একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং আনন্দময় ফুটবল দীর্ঘদিন মনে রাখবে বিশ্ব।
আজ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবলে নেইমারের পথচলা আপাতত চলবে। তবে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে তার হাসি, কান্না, গোল উদযাপন এবং জাদুকরী ফুটবল আর দেখা যাবে না। কোটি কোটি সমর্থকের কাছে এটি এক যুগের অবসান। ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে নেইমারের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তিনি ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।







0 comentários:
Post a Comment